কুমিল্লা জেলার কেন্দ্রস্থল থেকে আট মাইল দূরে ময়নামতি অবস্থিত। ময়নামতি ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা এবং প্রায় এগারো মাইল বিস্তৃত। এই পাহাড়গুলো অতীতে বৌদ্ধবিহার, ও সস্তূপ ইত্যাদিতে পূর্ণ ছিল। খননকার্যের ফলে এখানে অনেক প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও সস্তূপের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৪৩-৪৪ সালে এ সকল নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। সে সময় এগুলো ঢিবি আকারে ছিল। স্থানীয় লোকেরা এসব ঢিবি থেকে ইট সংগ্রহ করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কুমিল্লা বিমানবন্দর তৈরির সময় ঠিকাদাররাও এসব ঢিবি থেকে ইট সংগ্রহ করত। ফলে অনেক মূল্যবান প্রত্নবস্তু নষ্ট ও হারিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সরকার ২০টি নিদর্শনকে প্রাচীন কীর্তি রক্ষা আইনে সংরক্ষিত করেছে। তার মধ্যে ময়নামতি অন্যতম। এখানে ১৯৫৫-৫৬ সালে খননকাজ চালানো হয়। অনেক প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, স্তূপ, বুদ্ধমূর্তি, স্বর্ণ ও তাম্র মুদ্রা, মৃৎফলক, আসবাবপত্র এবং শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কৃত শিলালিপি হতে জানা যায় যে, এখানে পালবংশ, খড়গবংশ, চন্দ্রবংশ, দেববংশ প্রভৃতি বংশের বৌদ্ধ রাজারা রাজত্ব করতেন। এই বৌদ্ধ রাজবংশের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ময়নামতি অঞ্চলে অনেক বৌদ্ধবিহার চৈত্য স্তূপ প্রভৃতি নির্মিত হয়। খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত ময়নামতি ছিল বৌদ্ধধর্মের প্রাণকেন্দ্র। বৌদ্ধ বিহারগুলো বিদ্যাচর্চার জন্যও প্রসিদ্ধ ছিল। এখানে বিদেশ থেকে পণ্ডিতেরা বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা করতে আসতেন।
শালবন মহাবিহার
কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার হলো শালবন মহাবিহার। খননকার্যের ফলে শালবন মহাবিহারের ধ্বংসস্তূপে একটি তাম্রলিপি পাওয়া যায়। সেই তাম্রলিপি হতে জানা যায় যে, শালবন মহাবিহারটি রাজা ভবদেব নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন দেববংশের রাজা আনন্দদেবের পুত্র। অষ্টম শতাব্দীর দিকে দেববংশ এ অঞ্চল শাসন করতেন। উক্ত বিহারের ধ্বংসাবশেষ হতে বোঝা যায়, বিহারটি ছিল বর্গাকৃতির। প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৫৫০ ফুট। বিহারের চারদিক দেয়ালবেষ্টিত। দেয়ালের উচ্চতা সাড়ে ১৬ ফুট ।
বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান

এই বিহারে ১১৫টি কক্ষ ছিল। সব কক্ষই সমান। কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস করতেন। একটি কক্ষ থেকে অপর কক্ষ ৫ ফুট পুরু দেয়াল দিয়ে পৃথক করা। উত্তর দিকে একটি মাত্র প্রবেশপথ ছিল। বিহারে প্রবেশের সিঁড়িও উত্তর দিকে ছিল। মূল বিহারটি কুশ আকৃতির। এটি ইট নির্মিত এবং বিহার অঙ্গনের মধ্যস্থলে অবস্থিত। এটি আয়তাকার। দৈর্ঘ্যে ১৬৮ ফুট, প্রস্থে ১১০ ফুট। বিহারকে বেষ্টন করে ৭ ফুট চওড়া প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে। বিহার গাত্রের দেয়াল সারি সারি পোড়ামাটির ফলকচিত্রে অলংকৃত ছিল।
বিহারাঙ্গনে আরো অনেক স্থাপত্যের নিদর্শন আছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্তম্ভবিশিষ্ট একটি হলঘর আছে। কেন্দ্রীয় বিহারের পশ্চিমে দুটি ছোট মন্দির আছে। বিহারের বাইরে উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে ৬০ ফুট দূরে বর্গাকৃতির একটি চার কোনাকার বিহার আছে। পূজাকক্ষ বিহারের মধ্যস্থলে অবস্থিত।
খননের ফলে এখানে বহু প্রত্নসম্পদ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ৮টি তাম্রলিপি, স্বর্ণ, রৌপ্য মুদ্রা, অলংকার, ব্রোঞ্জের বুদ্ধ, ও বোধিসত্ত্বমূর্তি, নানা দেব-দেবীর মূর্তি, পোড়ামাটির অসংখ্য ফলক, অলংকৃত ইট, প্রস্তরমূর্তি, তামার পাত্র এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিসপত্র উল্লেখযোগ্য। মুর্তিগুলো খুবই সুন্দর এবং মুল্যবান।
শালবন মহাবিহার ছিল বৌদ্ধধর্ম চর্চার প্রাণকেন্দ্র। বৌদ্ধধর্ম ছাড়াও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় এই বিহারে শিক্ষা দেওয়া হতো। বিদ্যাপীঠ হিসেবে এ বিহারের খুব সুখ্যাতি ছিল। দেশ-বিদেশ থেকে পণ্ডিতেরা এখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য আসতেন। দেববংশ, চন্দ্রবংশ ও পালবংশের রাজারাও এই বিহারের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বিহারটি চার শ বছর টিকে ছিল।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more